
ফজলুর রহমান বাবুবনলতা সেন কোথায় থাকেন?
'আলো-অন্ধকারে যাই_মাথার ভিতরে স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে! স্বপ্ন নয়,_শান্তি নয়_ভালোবাসা নয়, হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়! আমি তারে পারি না এড়াতে, সে আমার হাত রাখে হাতে; সব কাজ তুচ্ছ হয়,_পণ্ড মনে হয় সব চিন্তা_প্রার্থনার সকল সময় শূন্য মনে হয় শূন্য মনে হয়!'
_বোধ জীবনানন্দ দাশ
একবার চিন্তা করুন তো এর ওপরে কোনো লাইন হয়? আমার সব চিন্তা, আমার সব কাজের উৎস, আমার সব প্রেরণা এই লাইনগুলোর মধ্যে খুঁজে পাই। আমার ধারণা, যারা এ কবিতাটি একবারের জন্য পড়েছে, চিন্তা করেছে_তাদের সবার মধ্যেই এই বোধ কাজ করে। আমার প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের সব কবিতাই আমার প্রিয়। শুধু প্রিয় বললে ভুল হবে। অসম্ভব প্রিয়। তাঁর প্রতিটি কবিতায় আমি নিজেকে পাই।
আমাকে যখন কেউ প্রশ্ন করে প্রিয় লেখক বা প্রিয় কবি কে_আমি অকপটে জীবনানন্দ দাশের নাম বলি। স্বভাবতই পরের প্রশ্ন চলে আসে। কেন প্রিয়? এবার আমি দ্বিধায় পড়ে যাই। কেন প্রিয় নয়?
আমার প্রথম যৌবনের কথা বলি। আমি তখন কলেজে পড়ি। মনের মধ্যে প্রেম চলে এসেছে। এটা যে কলেজে পড়ার সময় এসেছে তা নয়। খানিক আগে থেকেই বোধ হয়। সবার যা হয় আর কি! প্রকৃতিগতভাবেই প্রেম চলে এসেছিল আমার মধ্যেও। তখন থেকেই ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল জীবনানন্দ। আজও বের হয়নি। অথবা আমিই বের হতে দিইনি। তখন এই কবির একটা কবিতা সব সময় আমার মাঝে বসবাস করেছে (এখনো যে করে না তা কিন্তু নয়)। সবাই হয়তো বুঝেও গেছে। হ্যাঁ, সেই বনলতা সেন। নাটোরের বনলতা সেন। আমার ধারণা, বনলতার প্রেমে শুধু কবিই পড়েননি; আমিও পড়েছিলাম। কত দিন ঘুমের মধ্যে যে সেই শ্রাবস্তীর কারুকার্যময় বনলতার মুখোমুখি বসেছি_তার ইয়ত্তা নেই। প্রেমে পড়ব না কেন বলেন? কবি লিখেছেন, 'চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা/মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের 'পর/হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা/সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর/তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, 'এত দিন কোথায় ছিলেন?' পাখি নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।'_বনলতা সেন/ জীবনানন্দ দাশ
একজন নারীর রূপের যে বর্ণনা কবি করেছেন, তা অন্য কোনো কবি এত সহজে করতে পেরেছেন কি না আমার জানা নেই। নাবিকের পথ হারানো আর সেই পথ ধরে বনলতাকে খুঁজে পাওয়া_এটা আমার মধ্যে এনে দিয়েছিল কবির এ কবিতা। আমি বহুবার জীবনে প্রেমে পড়েছি। এ কবিতার কারণেই। তিনি লিখেছেন, 'সব পাখি ঘরে ফেরে_সব নদী_ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন/থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।' আমার এখনকার জীবনের সঙ্গে এই লাইন কয়টি মিলে যায়। আমি সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শুটিং করি। তারপর ঘরে ফিরি। আমার বনলতা সেনের কাছে। আমার স্ত্রীর কাছে। এখন সে-ই আমার বনলতা সেন।
এখন আমার জীবনে পরিবর্তন এসেছে। যুবক থেকে বয়সের দিকে ছুটে চলেছে জীবন। সারা দিন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি। পরিবারের কাছের লোকদেরই ঠিকমতো সময় দিতে পারি না। কিন্তু মাঝেমধ্যে সেই কবিতাগুলো আমাকে আটকে দেয়। থামিয়ে দেয়। যুবক বয়সে যে কবিতা আমার ভালো লাগত, সে কবিতা এই বয়সে ভালো না লাগারই কথা। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো, কবির প্রতিটি কবিতা আমার এখনো সমান ভালো লাগে। ৭০-৮০ বছর আগে লেখা সেই কবিতা এখনকার সময়ের সঙ্গে মিলে যায়। মিশে যায়। সেই হিসেবে জীবনানন্দ হলো সমসাময়িক কবি। চিন্তা করুন তো ওই সময়ে এত আধুনিক কবিতা লেখা কত কঠিন ছিল! পাঠক যখনই তাঁর কবিতা পড়েন না কেন, মনে হবে এ সময়ের জন্যই এই লেখা। কখনো পুরনো মনে হবে না। ১০০ বছর পরও যদি জীবনানন্দের কবিতা কেউ পড়ে, মনে হবে এখনকার জন্যই এই কবিতা। আর আমার ক্ষেত্রে যেটা হয় তা হলো, আমি যেখানেই যাই না কেন আমার সঙ্গে কিভাবে কিভাবে জানি জীবনানন্দের দেখা হয়ে যায়। মানে তার বই আমার হাতে চলে আসে। ধরুন, দূরে কোথাও শুটিংয়ে গেছি কিংবা কোনো বন্ধুর বাসায় বেড়াতে গেছি, দেখা পেয়ে গেছি তাঁর বইয়ের। আমার সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায় নিমেষেই। কবিতাও যে ক্লান্তি দূর করতে পারে, এটা শুধু জীবনানন্দের কবিতায়ই আমি পাই।
একটা ব্যাপার হলো, জীবনানন্দের মতো এমন দূরদর্শিতা খুব কম কবির মধ্যেই ছিল। তাঁর যে অনুধাবন ক্ষমতা, তাঁর যে কল্পনাশক্তি, তাঁর যে দেখার চোখ, তাঁর যে উপলব্ধি_এটা আমাকে অবাক করে। একটা কবিতার লাইন হলো, 'অন্ধকারে জেগে ওঠে ডুমুরের গাছে/চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড়ো পাতাটির নিচে ব'সে আছে/ভোরের দোয়েল পাখি...একদিন অমরায় গিয়ে/ ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়/বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়।'_বাংলার মুখ আমি/ জীবনানন্দ দাশ
কবিতাটিতে বাংলার যে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এটা কিন্তু সহজ ব্যাপার নয়। এই যে অন্ধকারে জেগে ওঠা ডুমুরের গাছে দোয়েল পাখির বসে থাকা, এটাও কবির চোখ এড়ায়নি। তিনি তাঁর কবিতায় যে সৌন্দর্যগুলো তুলে এনেছেন, এটা সহজে কারো চোখে পড়ে না। তিনি সৌন্দর্যের কবি_এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
জীবনানন্দ নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। তাঁকে নিয়ে, তাঁর লেখা নিয়ে যে কিছু লিখতে পারছি, এটাও আমার জন্য গর্বের। তাঁর সৃষ্টি সবার মতো আমাকেও আন্দোলিত করে_এটা প্রকাশ করাও কম আনন্দের নয়।
এ ছাড়া সমসাময়িক কিছু কবির কবিতা আমার ভালো লাগে। নির্মলেন্দু গুণ এর মধ্যে অন্যতম। তাঁর 'তোমার চোখ এত লাল কেন' কবিতা আমি মুগ্ধ হয়ে পড়ি। কেন যে এত ভালো লাগে এই ব্যাখ্যা আমার পক্ষে দেওয়া কঠিন। 'আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে শুধু চাই...' এই লাইনগুলো অসাধারণ। ভালোবাসা ছাড়াও তাঁকে আমার দরকার। এই যে আবেদন_এটা কিন্তু অন্য রকম ব্যাপার। এ ছাড়া অনেক কবির কবিতাই আমার ভালো লাগে।
সবশেষে আমার প্রিয় কয়েকটি লাইন দিয়ে শেষ করছি। আমার মনে হয় এ লাইনগুলো আমার জন্যই লেখা। আমাকে উদ্দেশ করে কবি লিখেছেন_
'হে প্রগাঢ় পিতামহী, আজো চমৎকার? আমিও তোমার মতো বুড়ো হবো_বুড়ি চাঁদটারে আমি ক'রে দেবো কালীদহে বেনোজলে পার;আমরা দু'জনে মিলে শূন্য ক'রে চ'লে যাবো জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার'
_আট বছর আগের একদিন জীবনানন্দ দাশ
Source: Kalerkantho, 14th April,2010
No comments:
Post a Comment